বিশেষ প্রতিনিধি, মোঃ মনির।।
অনলাইন খবর:// বাংলাদেশের ব্যাংক খাত ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মূলধন সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশের শীর্ষ ২০টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা—যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড। আগের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় মাত্র তিন মাসে এই ঘাটতি বেড়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা।
মূলধন ঘাটতির প্রভাবে বেশিরভাগ ব্যাংক এখন একক ঋণগ্রহীতা সীমায় আটকে পড়েছে। এর ফলে তারা নতুন করে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণে অক্ষম হয়ে পড়েছে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। একইসঙ্গে প্রভিশন ঘাটতির কারণে এসব ব্যাংকের ক্রেডিট রেটিং অবনমিত হচ্ছে। ফলে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহ দিন দিন ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি কেবল ব্যাংক খাত নয়—সমগ্র অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। এখনই মূলধন পুনর্গঠন, প্রভিশনিং নীতিমালা শক্তিশালীকরণ এবং স্বচ্ছ ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সংকট উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সামনে আরও বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
সংকটজনক পর্যায়ে সিআরএআর
ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আওতায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক খাতের মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) গত ডিসেম্বর মাসের শেষে নেমে এসেছে মাত্র ৩.০৮ শতাংশে। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এই অনুপাত কমপক্ষে ১০ শতাংশ হওয়া বাধ্যতামূলক। সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সিআরএআর ছিল ৬.৮৬ শতাংশ, অর্থাৎ মাত্র এক প্রান্তিকেই তা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
কোন ব্যাংক কতটা ঝুঁকিতে
সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। এই ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ ৫২ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। এরপর ঘাটতিতে রয়েছে—বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ১৮,১৮৮ কোটি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১৩,৯৯১ কোটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ১২,৮৮৫ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক ৭,৭৯৮ কোটি টাকা। এছাড়া আরও চারটি ব্যাংক নতুন করে মূলধন ঘাটতির তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
এনপিএল ও প্রভিশন ঘাটতি
মূলধন সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে খেলাপি ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল)। ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৪৫ লাখ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ২০.২ শতাংশ। এর ফলে ১৩টি ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, প্রভিশনিং হার বৃদ্ধি পাওয়ায় মার্চের তথ্য যখন পাওয়া যাবে, তখন পরিস্থিতি হয়তো আরও খারাপ হতে পারে। এসএমএ ঋণের জন্য আগে ১ শতাংশ প্রভিশন রাখলেই চলতো, এখন তা ৫ শতাংশ।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন সংকট শুধু আর্থিক সূচকের দুর্বলতা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে। এখনই কার্যকর সংস্কার, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত না করলে সামনে বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে উঠবে।