বিশেষ প্রতিনিধি, মোঃ মনির।।
আব্দুল কাইয়ুম খান
খুলনা মংলা মহাসড়ক ও ঢাকা খুলনা (মোল্লাহাট -কাটাখালি ) মহাসড়কটি অত্যন্ত দুর্ঘটনা প্রবণ হয়ে উঠেছে । প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট ,বড় দুর্ঘটনা । ২০২৫ সালে খুলনা মংলা মহাসড়কে মোট ৪৬ টি উল্লেখযোগ্য দুর্ঘটনায়, ঘটনা স্থলে প্রাণ হারায় ২০ জন, আহত অবস্থায় উদ্ধার হয় ১২১ জন । চলতি বছরের ৪ মাসে উল্লেখযোগ্য সড়ক দুর্ঘটনা ১৬ টি । এ সমস্ত দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করে২২ জন আহত অবস্থায় উদ্ধার হয় ১২ জন। ঢাকা খুলনা মহা সড়কে ( মোল্লাহাট - কাটাখালি) ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য ১৭ টি দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৭ জন । চলতি বছরের ৪ মাসে উল্লেখযোগ্য সড়ক দুর্ঘটনা ৮ টি । এতে ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করে ৫জন । পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও মৃত্যুহার প্রায় দ্বিগুণ ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও ব্যস্ততম মংলা সমুদ্র বন্দরের খুলনা ও ঢাকা থেকে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনে এটি প্রধান সড়ক । নিয়মিত মংলা বন্দর থেকে এ পথে কয়েক হাজার পণ্যবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করে । এছাড়া রাজধানী থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলার পরিবহন যোগাযোগে এ মহাসড়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর সড়ক দুটির ব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণ কিন্তু সেই অনুযায়ী মহা সড়কের প্রশস্ততা বাড়েনি। ব্যস্ততম মহাসড়কের সাথেই বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ট্রাক ও গাড়ি মেরামতের কারখানা । এসব কারখানাতে ট্রাক ও গাড়ি মেরামতের জন্য লম্বা লাইনে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকে । দ্রুতগামী যানবহন অনেক সময় রাস্তা সংলগ্ন গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। মহাসড়ক দুটির দুপাশে অবৈধভাবে অসংখ্য চায়ের দোকান ,হোটেল রেস্তোরাঁ, বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট , কাঠের গোলা ইত্যাদি গড়ে উঠেছে। ফলে বিভিন্ন রকম যানবাহন এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের সামনে বিভিন্ন কারণে দাঁড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে রাতের বেলায় দ্রুতগামী যানবাহন সমূহ বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহন সমুহের উপর আছড়ে পড়ে। মহাসড়কে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, মহাসড়কে সংগঠিত অপরাধ দমন, যানজট নিরসন, যানবাহনের গতিসিমা পর্যবেক্ষণ সহ মহাসড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত হাইওয়ে পুলিশের ২টি থানা এ অঞ্চলে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে । খুলনা মংলা মহাসড়কে দায়িত্বরত কাটাখালি হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ জাফর আহমেদ বলেন, খুলনা মংলা মহাসড়কে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা প্রবন হয়ে উঠেছে বেলাই ব্রিজ ও গুনাই ব্রিজ সংলগ্ন প্রায় ১ কিলোমিটার এলাকা ।এখানে নতুন করে ডাবল ব্রিজ নির্মিত হওয়ায় দূর দূরান্ত থেকে আসা চালকেরা রোড সিগন্যাল না বুঝেই ভুল পথে যানবাহন পরিচালনা করে । ফলে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন সমূহের সাথে সংঘর্ষ ঘটে । এছাড়া বেলাই ব্রিজ ও গুনাই ব্রিজের দুইপাশ ঢালু থাকায় এপারের যানবাহন ওপরের যানবাহনকে দেখতে পারেনা । ভুল পথে ঢুকলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা প্রবলভাবে বেড়ে যায়। গত রমজানে এরকম একটি দুর্ঘটনায় ঘটনা স্থলে প্রাণ হারায় একই পরিবারের ১৩ সদস্য । এছাড়া ব্যস্ততম এ মহাসড়কটি মংলা সমুদ্র বন্দরের সাথে সারাদেশের স্থল যোগাযোগের একমাত্র সড়ক । ১৯৫০ সালে মংলা বন্দর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মহাসড়কটি চালু হয়। কালের পরিক্রমায় ৭৬ বছরে পদার্পণ করলেও উল্লেখযোগ্য ভাবে এর প্রশস্ততা বাড়েনি। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে এই মহাসড়কের ব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণ। যানবাহনের কিন্তু উল্লেখযোগ্যভাবে রাস্তার প্রশস্ততা না বাড়ায় প্রতিবছর দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এছাড়া মহাসড়কের সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য গ্রামীন সড়কের সংযোগ । গ্রামীণ সড়কগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিচু থেকে এসে মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত হয় । ফলে অনেক সময় গ্রামীন সড়ক থেকে মহাসড়কে উঠা যানবাহন চালকেরা মহাসড়কের দুই পাশের চলমান যানবাহনের অবস্থান ঠিকমতো লক্ষ্য করতে পারেনা । এ কারণে ও অনেক সময় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে । গ্রামীণ সড়ক গুলো যদি একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে উঁচু করে মহাসড়কের সাথে সংযোগ স্থাপন করা যায় তাহলে এ পর্যায়ের দুর্ঘটনা কমে আসবে। এছাড়া মহাসড়কের সাথে থ্রি হুইলার চলার জন্য আলাদা রাস্তা তৈরি করতে পারলে সেক্ষেত্রে থ্রি হুইলার সমূহের কারণে ঘটা দুর্ঘটনা সমূহ অনেকাংশে কমে আসবে।
মোল্লাহাট হাইওয়ে থানা অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন ঢাকা খুলনা মহাসড়ক আমার থানা এলাকাধীন । এখানে মোল্লাহাট থেকে কাটাখালি মোড় পর্যন্ত যত্রতত্র চায়ের দোকান , হোটেল রেস্তোরাঁ ,ট্রাক টার্মিনাল গড়ে উঠেছে। ফলে ২ লেন বিশিষ্ট রাস্তার পাশে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করলে দ্রুতগামী যানবাহনের ক্ষেত্রে ওভারটেকিং করার সময় অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া এ মহাসড়কে রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটি হাট বাজার রয়েছে । সড়ক সুরক্ষিত ও দুর্ঘটনা মুক্ত রাখতে হলে মহাসড়কের এই অংশটি প্রশস্ত করণসহ স্থানীয় বাস ট্রাক মালিক সমিতি, ড্রাইভার ও জনসাধারণের সচেতনতা ,স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সার্বিক বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি, অদক্ষ চালক দিয়ে গাড়ি না চালানো, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মহাসড়কে পর্যাপ্ত সিগন্যালিং এর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ও দূরপাল্লার যানবাহন সমূহে ২ জন করে দক্ষ চালক রাখা । যাতে চালকেরা ১২- ১৪ ঘন্টা গাড়ি চালানোর সময় ক্লান্তি অনুভূত হলে, অপরচালক যানবহন পরিচালনা করতে পারে। মালিক পক্ষ থেকে এ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে সড়কে যেমন শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব তেমনি দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। স ও জ এর বাগেরহাট নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম এর সাথে সার্বিক বিষয়ে আলাপ কালে তিনি জানান, খুলনা মংলা মহাসড়কটি ৪ লেনে উন্নীত করণের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয় রয়েছে । প্রকল্পটি পাশ হলেই এ কাজ দ্রুত শুরু হবে । বেলাই ব্রিজ ও গুনাই ব্রিজ সহ খুলনা মংলা মহাসড়ক এবং ঢাকা খুলনা মহাসড়কে (মোল্লাহাট -কাটাখালি অংশে ) পর্যাপ্ত পরিমাণ রোড সিগন্যালিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে । তিনি আরো জানান সড়কে শৃঙ্খলা ধরে রাখতে এ সকল ব্যবস্থা দ্রুত নিশ্চিত করা হবে। এছাড়া আসন্ন ঈদুল আজহার আগেই ঢাকা খুলনা ও খুলনা মংলা মহাসড়কের বাগেরহাট স ও জ এর আওতাধীন মহাসড়ক সংলগ্ন সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।