মতিউল ইসলাম. হৃদয়://
গাজীপুর জেলা আদালত প্রাঙ্গণের কোট গারদ (হাজতখানা) এখন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থী ও আসামিদের স্বজনদের কাছ থেকে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যেই হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। টাকা দিলেই মিলছে হাজতে থাকা আসামিদের সাথে একান্তে কথা বলার সুযোগ, আর টাকা না দিলে জোটে দূরছাই ও দুর্ব্যবহার—এমনই গুরুতর অভিযোগ উঠেছে সেখানে কর্মরত কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিও এবং স্থিরচিত্রে এই অনিয়ম ও প্রকাশ্য লেনদেনের এক লণ্ডভণ্ড চিত্র ফুটে উঠেছে।
প্রকাশ্যেই চলছে টাকা লেনদেন
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী জানান, কারাগার থেকে আদালতে হাজিরা দিতে আসা আসামিদের কোট গারদে রাখার পর থেকেই শুরু হয় এই বাণিজ্য। আসামিদের সাথে স্বজনদের দেখা করানো বা বাড়ি থেকে আনা খাবার পৌঁছে দেওয়ার নাম করে সুনির্দিষ্ট অংকের টাকা দাবি করা হয়।
সংগৃহীত চিত্রে দেখা যায়, কোট গারদের বাইরে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতেই সাধারণ পোশাকে থাকা কিছু দালাল এবং সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে টাকার লেনদেন চলছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পোশাক পরিহিত সদস্যদের চোখের সামনেই এই প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য চলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ আইনজীবীরাও।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ
আদালতে স্বজনের হাজিরা দিতে আসা এক বৃদ্ধা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, "ছেলের সাথে একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু গেটে থাকা পুলিশ সরাসরি টাকা দাবি করে। টাকা দিতে না পারায় আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।"
আরেক ভুক্তভোগী জানান, আসামিদের জন্য আনা দুপুরের খাবার ভেতরে পাঠাতে হলেও নির্দিষ্ট হারে "বখশিস" বা এন্ট্রি ফি দিতে হয়। অন্যথায় খাবার ভেতরে পৌঁছায় না কিংবা দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়।
আইনজীবী ও সুশীল সমাজের উদ্বেগ
গাজীপুর আদালতের সাধারণ আইনজীবীদের মতে, আদালত প্রাঙ্গণ হলো মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার শেষ আশ্রয়স্থল। সেখানেই যদি খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের উপস্থিতিতে এমন প্রকাশ্য অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য চলে, তবে বিচার ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা সংকটে পড়বে। তারা দ্রুত এই চক্রের বিরুদ্ধে বিভাগীয় এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এই অব্যবস্থাপনা ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে গাজীপুর আদালত পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। কর্মকর্তারা জানান, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ছড়িয়ে পড়া ছবির
আদালতের মতো একটি সংবেদনশীল জায়গায় এমন প্রকাশ্য সিন্ডিকেট কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে, তা নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠছে। সাধারণ মানুষ ও বিচারপ্রার্থীদের দাবি, অনতিবিলম্বে এই ‘ঘুষের আখড়া’ বন্ধ করে আদালত প্রাঙ্গণে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা হোক।