ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের রফতানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা

  • আপলোড তারিখঃ 11-07-2025 ইং |
  • নিউজটি দেখেছেনঃ 485784 জন
বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের রফতানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা ছবির ক্যাপশন: ১

অনলাইন://




বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের রফতানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাল্টা শুল্ক হিসেবে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প ঘোষিত এই নতুন শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশি রফতানিকারকদের বর্তমানের ১৫ শতাংশসহ মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। এ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউজ ঘোষিত ৯০ দিনের শুল্ক বিরতির সময়সীমা শেষ হতে চলেছে। এ কারণে নতুন শুল্ক হার কার্যকর হতে যাচ্ছে আগামী ১ আগস্ট থেকে। যদিও পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, এটি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল বুধবার (৯ জুলাই)। এ সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারলে শুল্কহার হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে, নইলে ঘোষিত হারই কার্যকর হবে। এর আগে মার্চ মাসেই সব দেশের রফতানি পণ্যের ওপর অন্তত ১০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।


যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড় শুল্ক হার ছিল ১৫ শতাংশ। নতুন করে ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকর হলে মোট শুল্ক হার দাঁড়াবে ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠাতে হলে এখন প্রতি ১০০ টাকায় ৫০ টাকার শুল্ক দিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই শুল্ক আরোপ কার্যকর হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজারে (যুক্তরাষ্ট্রে) পণ্যের প্রতিযোগিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। রফতানিকারকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত ও ফলপ্রসূ আলোচনা না হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

চট্টগ্রামের ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘৫০ শতাংশ শুল্ক দিয়ে মার্কিন ক্রেতারা বাংলাদেশি পোশাক কিনতে আগ্রহ হারাবে। এতে রফতানিতে বড় ধস নামতে পারে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, এর প্রভাব ইউরোপের বাজারেও পড়তে পারে। কারণ, তখন ইউরোপের অনেক ক্রেতা এ সুযোগে দাম কমানোর চাপ তৈরি করবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় অগ্রগতি না হওয়ায় রফতানিকারক মহলে অসন্তোষ বাড়ছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সই করেছে। ভারতও চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। অথচ বাংলাদেশ মাত্র এখন আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসেছে। বর্তমানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন।

চিঠি চালাচালির প্রেক্ষাপট বলছে, শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসার পর গত এপ্রিলে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ট্রাম্পকে চিঠি লিখে সময় চেয়েছিলেন। বাণিজ্য উপদেষ্টাও জেমিসন গ্রিয়ারকে চিঠি দিয়ে আলোচনার আগ্রহের কথা জানান। এরপর মে মাসে ইউএসটিআর বাংলাদেশকে লিখিত প্রস্তাব পাঠায়। তবে কার্যকর কোনও সমাধান হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা কি তাহলে  ব্যর্থ?

যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ নীতির আওতায় বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেশজুড়ে উদ্বেগ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে—ঢাকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কি তাহলে ব্যর্থ হলো? সময় মতো প্রস্তুতি, কার্যকর লবিং ও কৌশলগত দূরদর্শিতার ঘাটতি—এই তিনটি প্রধান কারণ বিশ্লেষণ করে বোঝা যাচ্ছে, আলোচনার শুরুটা যত আশাব্যঞ্জক ছিল, শেষটা ততটাই হতাশাজনক।

২ এপ্রিল শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র তা তিন মাসের জন্য স্থগিত রাখে, যা বাংলাদেশের জন্য দরকষাকষির একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। শুরুতে দ্রুত চিঠি চালাচালি ও ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও জুন-জুলাই মাসে এসে ঢাকার পক্ষ থেকে আলোচনা দৃশ্যত শ্লথ হয়ে পড়ে। সরকারি একাধিক সূত্র বলছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কিছু ‘ইতিবাচক বার্তা’ পাওয়ার পর বাংলাদেশ ধরে নেয়— সময় আছে, চুক্তি এখনও সম্ভব। এই অতি-আত্মবিশ্বাসই আলোচনা থামিয়ে দেয়।

সুবিধা কি তাহলে হারিয়েছে ঢাকা?

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ১০০টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিলেও সেই তালিকা সময়মতো পাঠানো হয়নি। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম দ্রুত ও সুস্পষ্টভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে দরকষাকষি শুরু করে। ঢাকার বিলম্বিত পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের কাছে বাংলাদেশের আগ্রহ ও প্রস্তুতি নিয়েই প্রশ্ন তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পারস্পরিক শুল্ক চুক্তিতে এমন কিছু শর্ত ছিল, যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের পরিপন্থি। যেমন- যেসব পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্ক ছাড় দেওয়া হবে, তা অন্য কোনও দেশকে দেওয়া যাবে না। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনও দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, বাংলাদেশকেও সেটি অনুসরণ করতে হবে—এমন শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান বলেন, “এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) পরিচয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার আশা অবাস্তব। ইতিহাসে কখনোই যুক্তরাষ্ট্র এলডিসিদের প্রতি বিশেষ সহানুভূতি দেখায়নি।”

লবিংয়ের অভাব

বিজিএমইএ’র প্রস্তাব অনুযায়ী ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ লবিস্ট নিয়োগে সরকারের অনীহাও আলোচনার ব্যর্থতায় বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে লবিং ছাড়া কোনও বাণিজ্য আলোচনায় সফল হওয়া কঠিন। আমরা প্রস্তাব দিলেও সরকার পদক্ষেপ নেয়নি।”

এই বাস্তবতায়, যেখানে ভিয়েতনাম আগেভাগেই কৌশলী অবস্থান নেয়, সেখানে বাংলাদেশ কূটনৈতিক ফ্রন্টে প্রায় এককভাবে লড়াই চালিয়েছে—তাও সময় হারিয়ে।

২৮ জুনে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের দূতাবাসে জানানো হয়—৩ জুলাইয়ের মধ্যে চুক্তি না হলেও শুল্ক কার্যকর এক বছর পর্যন্ত পেছাতে পারে। এ তথ্যে ভর করেই বাংলাদেশ আলোচনার গতি হ্রাস করে। যদিও ৩ জুলাইয়ের পরেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে চিঠি পাঠায়, যা মূলত আলোচনার ওপর তাদের আস্থা হারানোর ইঙ্গিত।

সম্ভাবনা এখনও  আছে

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, “চুক্তি স্বাক্ষরের আলোচনা চলার মধ্যেই ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতাশাজনক। আমরা এখনও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।”

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান বাবু জানিয়েছেন, আমরা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশকে আরও সিরিয়াস ও স্পষ্ট হতে হবে। এই বার্তা থেকেই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই কঠিন অবস্থানে ছিল, কিন্তু বাংলাদেশ ছিল বিভ্রান্ত কৌশলের শিকার।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ায় দেশের রফতানি খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, আগামী ১ আগস্ট থেকে এই শুল্ক কার্যকর হলে অনেক কারখানা রফতানি সংকটে পড়বে, বিশেষ করে যাদের বড় অংশ মার্কিন বাজারনির্ভর।





কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
notebook

আবাসিক হোটেলের আড়ালে অবৈধ দেহ ব্যবসা: প্রশাসনের কড়া নজরদারি দাবি..