মোঃ কামরুল ইসলাম, রাংগামাটি জেলা প্রতিনিধি:-
রাঙ্গামাটি, ০৬ অক্টোবর, ২০২৫: আলোকময় প্রবারণা পূর্ণিমা ও ঐতিহ্যবাহী চিমিতং পূজার পবিত্র আবহে আজ মুখরিত হয়ে উঠল রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাজবন বিহার। উপাসক-উপাসিকা কার্যনির্বাহী পরিষদ ও বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীবৃন্দের সম্মিলিত উদ্যোগে বিহার প্রাঙ্গণে আয়োজিত হলো নানাবিধ ধর্মীয় পুণ্যানুষ্ঠান, যা শান্তি ও সম্প্রীতির এক অনন্য বার্তা বহন করে।
প্রতি বছরের মতো এবারও এই পূর্ণিমা তিথি উপলক্ষে দিনব্যাপী বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বুদ্ধমূর্তি দান, সংঘ দান, অষ্টপরিষ্কার দান, এবং হাজারো প্রদীপের আলোয় বিহারকে আলোকিত করার জন্য হাজার প্রদীপ দান। এছাড়া, বিশ্বশান্তি কামনায় নির্মিতব্য বিশ্বশান্তি প্যাগোডার উদ্দেশ্যে অর্থদান এর মতো মহতী উদ্যোগও এই পুণ্যানুষ্ঠানের অংশ ছিল।
এই পবিত্র অনুষ্ঠানে সম্প্রীতি ও শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার সম্মানিত পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন মহোদয়। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের এই প্রধান ধর্মীয় উৎসবে তাঁর উপস্থিতি স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণের মধ্যে এক নিবিড় বন্ধনের চিত্র তুলে ধরে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসক জনাব মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ (মারুফ) মহোদয় এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) জনাব মোঃ ইকবাল হোছাইন, পিপিএম মহোদয়। তাঁদের সঙ্গে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতৃবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন, যাঁরা সম্মিলিতভাবে সকলের কল্যাণ ও দেশের শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করেন।
পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির অঙ্গীকার বৌদ্ধ ধর্মমতে, প্রবারণা পূর্ণিমা হলো ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস (ভ্যাসসা) সমাপ্তির দিন। এটি মূলত আত্মশুদ্ধি, পাপমুক্তি এবং ভুল-ত্রুটি স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনার এক বিশেষ তিথি। এই দিনে উপাসক-উপাসিকারা বিহারে এসে শ্রদ্ধার সঙ্গে কঠিন চীবর দান ও অন্যান্য দানীয় কাজ সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে, ‘চিমিতং’ বা আকাশ প্রদীপ পূজা হলো হাজার প্রদীপ জ্বালিয়ে আকাশে উড়িয়ে দেওয়া যা বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বিশ্বকে আলোক দ্বারা আলোকিত করার প্রতীক। এই সম্মিলিত আয়োজন তাই কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের প্রতিচ্ছবি।
পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন মহোদয় তাঁর বক্তব্যে এই ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। রাঙ্গামাটি হলো শান্তি ও সম্প্রীতির এক লীলাভূমি। এই ধরনের পুণ্যানুষ্ঠান আমাদের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সৌহার্দ্য আরও জোরদার করে।
জেলা প্রশাসক জনাব মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ (মারুফ) মহোদয়ও তাঁর বক্তব্যে সকলকে প্রবারণা পূর্ণিমার শুভেচ্ছা জানান এবং রাঙ্গামাটির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
রাজবন বিহারের এই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণে দিনের শুরু হয় পবিত্র ত্রিপিটক পাঠ ও বুদ্ধ পূজা দিয়ে। এরপর একে একে চলে দানীয় কার্যাদি। হাজার প্রদীপের আলোয় যখন বিহারের চারপাশ আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন এক অপার্থিব শান্তিময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শত শত পুণ্যার্থীর উপস্থিতিতে এই উৎসব আবারও প্রমাণ করল, রাঙ্গামাটির মাটি সব ধর্মের মানুষের মিলনক্ষেত্র।
এই উৎসবের মাধ্যমে সকলে সম্মিলিতভাবে বিশ্বশান্তি কামনা করেন এবং আগামী দিনগুলোতেও দেশের স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতি বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।