স্টাফ রিপোর্টার : মোঃ নজরুল ইসলাম://
কুমিল্লার দেবিদ্বারে পৈতৃক সম্পত্তিতে মাটি ভরাটের কাজে বেআইনি বাধা প্রদান, শ্রমিকদের ওপর হামলা, মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি ও প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক চেয়ারম্যান এবং দেবিদ্বার পৌরসভা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব আবুল কাশেম (৭০) এর বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী সাংবাদিক মো. ফারুক হোসাইন জনি। তিনি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সমাধানের লক্ষে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন। সংযুক্ত নথিপত্র ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, দেবিদ্বার পৌরসভার অন্তর্গত মৌজায় সরকারি খতিয়ান ও আরএস রেকর্ড অনুযায়ী ভুক্তভোগী ফারুক হোসাইন জনির সর্বমোট জমি ১৪.২৬ শতক হলেও সরেজমিনে পরিমাপকৃত ১৩ শতক পাওয়া যায়। উক্ত সম্পত্তির সমুদয় সরকারি ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধিত এবং সংশ্লিষ্ট সকল কাগজপত্র তাঁর অনুকূলে হালনাগাদ রয়েছে। সম্প্রতি পাশের জমিতে যাতে মাটি ধসে না পড়ে, সে জন্য নিজস্ব খরচে ড্রাম কেটে এবং বাঁশ দিয়ে সুরক্ষা বেষ্টনী তৈরি করে মাটি ভরাটের কাজ শুরু করা হয়। নদী থেকে ড্রেজার বা বোটের মাধ্যমে পাইপ দিয়ে বালি এনে জমি ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হলে অভিযুক্ত আবুল কাশেম ও তাঁর সহযোগীরা পাইপ নেওয়ার পথ বন্ধ করে দেন এবং কাজ বন্ধ করে দেন। ভুক্তভোগী মো. ফারুক হোসাইন জনি জানান, আমার বৈধ ও পৈতৃক জমিতে মাটি ফালানোর কাজ চলাকালে সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাশেম বেআইনিভাবে লেবারদের ওপর চড়াও হন, অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন এবং কাজ আটকে দেন। অন্যায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিবাদ করায় তিনি চরম উত্তেজিত হয়ে আমাকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরবর্তীতে পাইপ বসাতে ও কাজ নির্বিঘ্নে চালিয়ে নিতে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না দিলে মাটি ফেলতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।সাংবাদিক মো. ফারুক হোসাইন জনি আরও জানান- তাদের মূল পৈতৃক সম্পত্তির পরিমাণ ৫০ শতক। ওয়ারিশ সূত্রে তাঁর বাবা ও দুই চাচার ভাগে ১৬ শতক ৬৬ পয়েন্ট করে জমি প্রাপ্য হয়। পরবর্তীতে অন্য দুই চাচা তাদের অংশের জমি বিক্রি করে দিলে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম তা ক্রয় করেন। অভিযোগ উঠেছে, দুই চাচার জমি ক্রয়ের পর আবুল কাশেম নিজের সীমানা বাড়িয়ে সাংবাদিক জনির বাবার অংশের জমি অবৈধভাবে দখলে নেন। নথি এবং বিএস রেকর্ড অনুযায়ী, সাংবাদিক জনির বাবার নামে ১৪ শতক ২৬ পয়েন্ট এবং অভিযুক্ত আবুল কাশেমের নামে ১৪ শতক ২৭ পয়েন্ট জমি রয়েছে। কিন্তু সরজমিনে পরিমাপ করে দেখা যায়, ভুক্তভোগীর দখলে রয়েছে মাত্র ১২ শতক ৭৫ পয়েন্ট (যা মতান্তরে প্রায় ১৩ শতক)। পক্ষান্তরে সাবেক চেয়ারম্যান কাশেমের দখলে চলে গেছে ১৭ শতকেরও বেশি জমি। সাংবাদিক ফারুক হোসাইন জনি বলেন, আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি তিন ভাগে বণ্টন হয়েছিল। আমার দুই চাচা তাদের অংশ বিক্রি করার কারণে আবুল কাশেমের জমি কখনোই মূল প্রাপ্য হিস্যার চেয়ে বেশি হতে পারে না। যেখানে বিএস রেকর্ডে আমাদের ১৪ শতক ২৬ পয়েন্ট পাওয়ার কথা, সেখানে ক্ষমতার দাপটে আমাদের জমি দখল করে রাখা হয়েছে। তিনি কেবল আমাদের জমিই নন, এলাকার যেখানেই তাঁর জমি আছে, সেখানেই গায়ের জোরে পাশের জমি থেকে ২ থেকে আড়াই শতক জায়গা দখল করে নেন, যা পুরো গ্রামের মানুষ জানে। তিনি আরও বলেন, আমার পৈতৃক সম্পত্তি বিএস রেকর্ড অনুযায়ী যতটুকু আমার বাবার নামে আছে, ঠিক ততটুকুই ফেরত চাই। আমি সরকার, প্রশাসন এবং সমাজপতিদের কাছে পৈতৃক সম্পত্তি উদ্ধারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জোর আকুল আবেদন জানাচ্ছি।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত আবুল কাশেম দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও তাঁর আচরণ বদলায়নি। অতীতে আওয়ামী লীগের পরিচয় ব্যবহার করে দেবিদ্বারের কাঁচাবাজার ও মাছবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় এবং সড়ক ও জনপথের (সওজ) সরকারি জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বর্তমানেও তিনি প্রভাব খাটিয়ে দখলদারি ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যখন ঝোপ বুঝে গা-ঢাকা দেওয়া কিংবা অপরাধের দায়ে কারাগারে থাকার কথা ছিল, তখনো প্রকাশ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী দোসর সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাসেম। তার এই অবাধ বিচরণে চরম ক্ষোভ এবং আতঙ্কে রয়েছে এলাকার ভুক্তভোগী মহল। বিগত সময়ে তার নানা অনিয়ম ও নির্যাতনের শিকার হওয়া মজলুম মানুষেরা এখনো সুবিচারের অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি—সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে তাকে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানানো হচ্ছে, কোনো রকম শিথিলতা না দেখিয়ে এই চিহ্নিত ব্যক্তিকে দ্রুত আইন এবং বিচারের আওতায় আনা হোক, যাতে স্থানীয় নিপীড়িত সাধারণ জনগণ শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। এই বিবাদীর পেশিশক্তি ও অন্যায় বাধার মুখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটিয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখে ভুক্তভোগী সাংবাদিক ইউএনও-র কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিজের পৈতৃক সম্পত্তিতে মাটি ভরাটের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানান। এ বিষয়ে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন- মো. ফারুক হোসাইন জনির লিখিত অভিযোগটি আমার হস্তগত হয়েছে। বিষয়টি তদন্তপূর্বক আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঘটনার বিষয়ে অভিযুক্ত সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবুল কাশেমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সম্ভব হয়নি। এদিকে এলাকার সাধারণ মানুষের সম্পদ সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন সচেতন স্থানীয় মহল।