অনলাইনখবর://
বাংলাদেশে জাতীয় অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই)। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহে ১৩ শতাংশের মতো উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস ঘটেছে, যা অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য এবং যাএাবাড়ী উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি) সম্প্রতি ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট-২০২৫’ প্রকাশ করেছে। বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) প্রকাশিত এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে নিট বা প্রকৃত বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ১২৭ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এই বিনিয়োগ প্রবাহ দেশের এক মাসের রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় অর্ধেক এবং বার্ষিক রফতানি আয়ের এক-চতুর্থাংশেরও কম। তুলনামূলকভাবে, ২০২৩ সালে দেশে এফডিআই ছিল ১৪৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার কম।
এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের এফডিআই প্রবাহের সামগ্রিক পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এফডিআইয়ের এই পতন অর্থনীতির জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়। বিশেষ করে, এই পরিমাণ বিনিয়োগ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের এক মাসের রেমিট্যান্সের অর্ধেক এবং রফতানি আয়ের মাত্র এক-চতুর্থাংশ। অর্থাৎ, দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তির তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ অনেক কম।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও প্রতিবেশী এবং সম-মাপক দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিনিয়োগের পতনের পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, বিনিয়োগ পরিবেশের অপ্রতুলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার অনিশ্চয়তা অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন দিক থেকে উদ্ভূত বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং বাণিজ্যযুদ্ধও এফডিআই প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশি বিনিয়োগের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি, সরকারের কর ব্যবস্থা, প্রণোদনা এবং বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
বিদেশি বিনিয়োগে বাংলাদেশ কতটা পিছিয়ে
২০২৪ সালের শেষে বাংলাদেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮২৯ কোটি ডলার, যা দেশের মোট জিডিপির মাত্র ৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার গড় হার যেখানে ১৩ শতাংশ, সেখানে ভারতের হার ১৪ শতাংশ এবং এমনকি ভুটানেরও হার ১৭ শতাংশ। গত বছর ভুটানে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৬ গুণ।
এছাড়া, গ্রিনফিল্ড ইনভেস্টমেন্ট (নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ) ঘিরে ঘোষিত অর্থের পরিমাণও ৩৫ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২০২৪ সালে ১৭৫ কোটি ডলারে, যা ২০২৩ সালে ছিল ২৭০ কোটি ডলার। এই হ্রাস ভবিষ্যতের বিনিয়োগ সম্ভাবনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
করোনাকালেও বেশি ছিল বিনিয়োগ
২০২০-২১ অর্থবছরেই করোনা মহামারির মাঝে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছিল ১.৭৭ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল তার আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি। এর চেয়েও উল্লেখযোগ্য, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ২.৬৩ বিলিয়ন ডলার—যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সেই তুলনায় ২০২৪ সালের পরিস্থিতি যথেষ্ট হতাশাজনক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এফডিআই প্রবাহ কমেছে প্রায় ২৯ শতাংশ। এ অবস্থায় অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কেবল করছাড় বা সম্মেলন আয়োজন যথেষ্ট নয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্য নীতিকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।