শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিলেও দেশে রয়ে গেছেন সদ্য ক্ষমতাচ্যুত সরকারের অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। এসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারের অনেক আমলা এখন দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন। একই চেষ্টায় আছেন আওয়ামী লীগ ও দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতারা। কিন্তু দেশ ছাড়তে গিয়ে বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে আটকে যাচ্ছেন তারা। এরই মধ্যে দেশ ছাড়ার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছেন সদ্য ক্ষমতাচ্যুত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল জুনাইদ আহমেদ পলকের। এ লক্ষ্যে গতকাল বিমানবন্দরে যান তিনি। তাকে দেশ ছাড়ার অনুমতি দেয়া হয়নি। বেলা ৩টার দিকে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে আটকে দেয়া হয় তাকে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একটি সূত্র জানায়, দিল্লি যাওয়ার উদ্দেশে জুনাইদ আহমেদ পলক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে অপেক্ষা করছিলেন। বেবিচক কর্মচারীরা তাকে চিনতে পারেন। পরে বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারা এসে পলককে নিয়ে যান।
একই বিমানবন্দরে আটকে দেয়া হয় ড. হাছান মাহমুদকে। তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদেও আছেন। গতকাল বিকালে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, ড. হাছান মাহমুদ দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু সফল হননি। তাকে আটকে দেয়া হয়েছে। তবে আটকে দেয়ার পর হাছান মাহমুদকে কোথায় রাখা হয়েছে, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে ৫ আগস্ট বিকালে ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশী মিশন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থাপ্রধানদের ব্রিফ করার কথা ছিল হাছান মাহমুদের। কিন্তু ওইদিন দুপুরের আগে শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা ঢাকার সড়ক দখলে নেয়া শুরু করার পর সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হয়। এর পর থেকে হাছান মাহমুদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। গতকাল বিমানবন্দরে ছাত্রলীগের দুই নেতাকেও আটকে দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। তারা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত ও ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মাহমুদ। এর মধ্যে সৈকতকে ইমিগ্রেশন থেকে আটক করা হয়। বর্তমানে তিনি ইমিগ্রেশনের হেফাজতে আছেন।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় গত ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগ রয়েছে এ দুই নেতার বিরুদ্ধে। ওইদিন শিক্ষার্থীদের ওপর দফায় দফায় হামলা হয়। আহত হয় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। হামলার সময় ছাত্রলীগ-যুবলীগের কোনো কোনো নেতাকর্মীর কাছে ছিল আগ্নেয়াস্ত্র।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়েন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) হিসাবরক্ষক নিজামুল হুদা। তাকে বিজিবির মাধ্যমে শিবগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। নিজামুল হুদার কাছে নগদ ৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা পাওয়া গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর ব্যাটালিয়নের (৫৯ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম কিবরিয়া সংবাদমাধ্যমে জানান, নিজামুল হুদার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সোনামসজিদ দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়।
শেখ হাসিনার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে গত সোমবার তার সরকারের পতন ঘটে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের আলোচনা চলছে। এদিকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ জেলা-উপজেলার বিভিন্ন কার্যালয়ে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। নেতাদের মারধর, হত্যা, বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটছে।
যে দাবির মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়লেন, সেই এক দফার উৎপত্তি কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে। ওই আন্দোলন দানা বাঁধা শুরু করে গত মাসের শুরুর দিকে। এর মধ্যে ১৫ জুলাই আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা শুরু হয়। এদিন আহত হয় তিন শতাধিক মানুষ। পরদিন ছয়জনের মৃত্যু হয়। ১৮ জুলাই মৃত্যু হয় ২১ জনের। ৫৮ জনের মৃত্যু হয় ১৯ জুলাই।
এর মধ্যে আন্দোলন ঘিরে প্রাণহানির বিচার দাবিতে এবং গণগ্রেফতারের প্রতিবাদে ৩ আগস্ট বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এদিন সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা করেন আন্দোলনকারীরা। এক দফা আদায়ে ৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়। একই দিন মাঠে নামে আওয়ামী লীগও। এদিন ভয়ংকর রূপ নেয় দেশের পরিস্থিতি, মৃত্যু হয় শতাধিক মানুষের। পরদিন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এদিন কারফিউ অমান্য করে সরকার পতনের দাবিতে রাজপথে নামে লাখো জনতা। এর মধ্যে দুপুরের পর খবর আসে, পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন শেখ হাসিনা।